ঐতিহাসিক টাইটানিক জাহাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

 

টাইটানিক ( Titanic ) :

চলুন ২০ শতকের ব্যাপক আলচিত টাইটানিক জাহাজ সম্পর্কে কিছু অজান তথ্য জেনে নেই।


নির্মাণ:


১৯০৯ সালের ৩১ মার্চ আয়ারল্যান্ডের বিখ্যাত কোম্পানি Hariand and Wolft এই বিখ্যাত টাইটানিক জাহাজ নির্মানের কাজ শুরু করে। প্রায় দুই বছর দুই মাস ধরে নির্মান কাজ চলতে থাকে। অবশেষে ৩১শে মে ১৯১১ সালে এটিকে সর্বপ্রথম পানিতে নামানো হয়।
* আনুষ্ঠানিক যাত্রা:

মালিক:

টাইটানিক জাহাজের মূল মালিক ছিল ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানি 'হোয়াইট স্টার লাইন' (White Star Line)। আর এই কোম্পানির মূল নিয়ন্ত্রক বা প্রধান ছিলেন মার্কিন কোটিপতি জে. পি. মরগান (J. P. Morgan), যার মালিকানাধীন কোম্পানি 'ইন্টারন্যাশনাল মেরিন টাইম কার্টেল' (IMTC)-এর অধীনে হোয়াইট স্টার লাইন পরিচালিত হতো।

উদ্বোধন:

 
 টাইটানিক জাহাজ উদ্বোধনের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ রয়েছে:
পানিতে ভাসানো বা অভিষেক (Launch): ৩১ মে, ১৯১১
প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা (Maiden Voyage): ১০ এপ্রিল, ১৯১২ প্রথম যাত্রা টি ছিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে।
প্রথম যাত্রায়(এটাই মূলত প্রথম ও শেষ যাত্রা ছিল) জাহাজটিতে নাবিক ও যাত্রী মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার দুইশ জন লোক ছিল।
নাবিক ক্রু ছিলেন প্রায় ৮৮৫ থেকে ৯০০ জন। এবং যাত্রী ছিলেন প্রায় ১ হাজার ৩২৪ জন।
*

আয়তন (দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ):


দৈর্ঘ্য ৮৮২ ফুট ৯ ইঞ্চি (২৬৯ মিটার) এবং প্রস্থ ৯২ ফুট (২৮ মিটার)।
* ও ওজন:
গ্রস রেজিস্টার টনেজ ছিল প্রায় ৪৬,৩২৮ টন এবং সম্পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় এর ওজন ছিল প্রায় ৫২,৩১০ টন।
* ধারণক্ষমতা:
সর্বোচ্চ ৩,৫৪০ জন যাত্রী ও ক্রু ধারণের ক্ষমতা ছিল।
*

নিমজ্জিত:


টাইটানিক জাহাজটি সমুদ্রের বুকে ভাসমান ছিল মাত্র ৪ দিন (ঠিকঠাক বললে, প্রথম যাত্রার পর মাত্র ৫ দিনের মাথায় এটি ডুবে যায়)।
১০ এপ্রিল, ১৯১২ তারিখে এটি প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে এবং ১৪ এপ্রিল রাতে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ১৫ এপ্রিল ভোররাতে পুরোপুরি ডুবে যায়।
*

যে কারণে নিমজ্জিত হয় :


বরফখণ্ডে ধাক্কা: ১৪ এপ্রিল, ১৯১২ সালের রাতে (রাত ১১:৪০ মিনিটে) আটলান্টিক মহাসাগরে একটি বিশাল হিমশৈল বা আইসবার্গের সাথে জাহাজটির সজোরে ধাক্কা লাগে।
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া: ধাক্কার ফলে জাহাজের সামনের ডান দিকের তলার অংশে প্রায় ৩০০ ফুট লম্বা ফাটল ধরে, যার কারণে একের পর এক পানিতীর ভেদ করে ওয়াটারটাইট কম্পার্টমেন্টগুলোতে পানি ঢুকতে শুরু করে।
ডুবে যাওয়া: মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে (১৫ এপ্রিল রাত ২:২০ মিনিটে) জাহাজটি সম্পূর্ণ ভেঙে দুই টুকরো হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের প্রায় ১২,৬০০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়।
*

হতাহত:


টাইটানিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর মোট ৭০৫ থেকে ৭০৬ জন মানুষ বেঁচে ফিরেছিলেন। লাইফবোটের স্বল্পতা এবং তীব্র ঠান্ডার কারণে প্রায় ১,৫১৭ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
*

ঐতিহাসিক শিক্ষা:


টাইটানিক জাহাজ সম্পর্কে মানুষের এই অতিরিক্ত অহংকার বা আত্মবিশ্বাসের বিষয়টি ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা। সে সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও প্রচারমাধ্যম দাবি করেছিল যে জাহাজটি "অমর" বা "অবিনশ্বর" (Unsinkable)। প্রকৃতির শক্তিকে উপেক্ষা করে মানুষের এই অতিরিক্ত আত্মম্ভরি ঘোষণাই যেন ট্র্যাজেডিটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
তবে প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে জাহাজটি পানিতে ভাসানো কোনো অসম্ভব বিষয় ছিল না, কারণ এটি তখনকার সময়ে প্রকৌশলবিদ্যার এক অবিশ্বাস্য কীর্তি ছিল। সমস্যাটি প্রযুক্তিতে ছিল না, সমস্যা ছিল মানুষের অতিরিক্ত অহংকার এবং নিরাপত্তাকে অবহেলা করার প্রবণতায়। পর্যাপ্ত লাইফবোট না রাখা এবং বরফাবৃত সমুদ্রের সতর্কবাণীকে অবজ্ঞা করার মাশুল দিতে হয়েছিল হাজারো নিরপরাধ প্রাণ দিয়ে।
ইতিহাসে টাইটানিকের পতন কেবল একটি জাহাজডুবি নয়, এটি মানুষের অন্ধ অহংকার এবং প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতার এক চিরন্তন প্রতীক।










Comments